Part 1: https://bazlur.ca/wp-content/uploads/2025/05/download-1.wav

Part 2 https://bazlur.ca/wp-content/uploads/2025/05/download-2.wav

ধুলোর স্বাদ কেমন হয়? আমাদের কারোরই জানার কথা নয়! এও কি জানার মত কিছু? তবে ছ’বছরের ইউসুফ এখন এই স্বাদটার সাথে বেশি পরিচিত। ধুলোয় তার জিভেতে একটা যেন প্রলেপ পড়ে গেছে, গলার পিছনেও খানিকটা জমে আছে। মনে হয় একটা খসখসে পর্দা। “মা,” সে মাঝে মাঝে ভাঙা গলায় নালিশ করে, “আমার মুখে খালি বালি।” ওর মা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, কী উত্তর দেবেন এতটুকুন বাচ্চাটাকে? কিছু ভেবে পান না। আগে চোখ বেয়ে পানি পড়ত। এখন আর পড়ে না। সব শুকিয়ে গেছে।

ঘরে পানি নেই। যতটুকু আছে অতটুকুই যেন যক্ষের ধন। একটু করে খেয়ে যে কোনো রকম বেঁচে থাকার আপ্রাণ চেষ্টা। ওর মা ওকে এক চুমুক পানি দিয়ে বলেন, “বারেফ ইয়া হাবিবি, হাওয়েল মা শেম্মো।” – আমি জানি আমার সোনা, নিশ্বাসে ধুলো না নেওয়ার চেষ্টা করো।

কিন্তু সে কী করে তা করবে? এটাই তো এখনকার বাতাস। তার স্মৃতিতে কেবল এতটুকুই আছে- তার কতগুলো চকচকে মসৃণ মার্বেল ছিল। এগুলো নিয়ে খেলতো। একটি আরেকটির সঙ্গে লেগে একধরণের ক্লিক ক্লিক শব্দ হতো। এই শব্দটা তার ভাল লাগতো খুব। মার্বেলগুলো ধরলে হাতে একটু ঠাণ্ডা ঠান্ডা লাগতো। মার্বেলগুলো তার এখন আর নেই। কোথায় হারিয়ে গেছে কে জানে। এছাড়া তার মায়ের হাতের বানানো সুগন্ধী জাতারের মশলা দেওয়া রুটি ছিল তার খুব প্রিয়। কি সুমিষ্ট গন্ধই না ছিল। এখন এগুলো মনে হয় না। স্মৃতিগুলো রোদে ফেলে রাখা পুরোনো ছবির মতো বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ওর চোখ ফেটে পানি বের হয়ে আসতে চায়। কিন্তু চোখে পানি নেই।

ইউসুফের ছোট বোন লায়লা! ওর বয়স কত? তিন বা চার। কে জানে। জন্মদিনগুলো এখন ঝাপসা। ওরা বসে আছে একটি বিধ্বস্ত দোকানের কোণায় মেঝেতে। মেঝেটি শক্ত। সে একটা বেসুরো গলায় একটি গান গুনগুন করে, ভাঙা ভাঙা সুর – অনেকটা হাহাকারের মতো শোনায়।

ইয়াল্লা তানাম লাইলা ইয়াল্লা তানাম

লা আদবাহ-লিক তেইর এল হামাম

রুহ্‌ ইয়া হামাম, লা তাস়াদ্দেক

বিদহাক আলা লাইলা লা-তনাম

“এটা কি মায়ের পায়রা পাখির গান?” ইউসুফ আস্তে করে জিজ্ঞেস করে। লায়লা শুধু ওর দিকে তাকায়, ওর চোখদুটো বেশ বড় বড়। চোখে মুখে ভাবলেশহীন। কিছুই বুঝতে না পারার দৃষ্টি – তারপর আবার গুনগুন শুরু করে।

হ্যাঁ এটিই মায়ের ঘুম পাড়ানোর গান –

ঘুমিয়ে পর লাইলা ঘুমিয়ে পর,

তোমার জন্য পায়রা পাখি এনে দেবো।

উড়ে যা পায়রা, বিশ্বাস করিস না

আমি তো লায়লাকে ভোলাতে চাইছি যাতে সে ঘুমায়।

কিন্তু লায়লার গলায় সেটা ভেঙে ভেঙে আসে, আর তার সাথে মিশে গেছে আকাশে সারাক্ষণ লেগে থাকা একটি তীক্ষ্ণ গোঙানির শব্দ- ভন ভন ভন ভন। ইউসুফ ওদের বলে ‘জানানা’ – রাগী বোলতা। অদৃশ্য এই ড্রোনগুলো ঝাঁকের মতো আকাশে ঘুরে বেড়ায়, ভন ভন অবিরাম একটা শব্দ। ভয়ংকর ও কুৎসিত বোলতা – যেকোনো সময় ওপর থেকে হঠাৎ করে হুল ফুটিয়ে দেবে।

শব্দটা যে সবসময় একরকম থাকে তা না; কখনও সেটা তীক্ষ্ণ আর ধারালো, অনেকটা দাঁতের ডাক্তারের ড্রিলের মতো, যেন দুর্বল হয়ে পড়া স্নায়ুকে আরও দুর্বল করে দেয়। আবার কখনও সেটা গভীর, গমগমে গুঞ্জনে তৈরি করে যা শুধু কানে নয়, ইউসুফের বুকের গভীরেও কাঁপুনি ধরিয়ে দেয়, নীরবতাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে ফেলে– বিস্ফোরণের প্রলয়ঙ্করী গর্জন – অবশ্যম্ভাবীভাবে আসবে এক্ষুণি।

“ওরা আজ খুব জোরে আওয়াজ করছে, ইউসুফ,” লায়লা ফিসফিস করে বলে, যখনই ভনভন শব্দটা বাড়ে, তার ছোট্ট শরীরটা ভাইয়ের গায়ে চেপে ধরে শক্ত করে, তার আঙুলগুলো ছোট ছোট নখের মতো ভাইয়ের বাহুতে বসে যায়। ইউসুফ ওকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করে। “দেখ, লায়লি! ওই পিঁপড়েটাকে দেখছিস? ও একটা আস্ত পাতা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে! কী জোর ওর!” ওর বয়স ছ’বছর হলেও এখন সে যেন লায়লার অভিভাবক। ওর আচরণও তাই। হঠাৎ করে যেন বড় হয়ে গেছে। ওর বোনকে নানারকম গল্প বলতে চায়– চালাক শিয়াল কী করে শিকারীদের বোকা বানায় আর সাহসী জেলেরা কী করে ঝড়ের সাথে লড়াই করে। “ঐযে একটা মাছটা উড়তে পারে, ওই গল্পটা বল।” সে বিড়বিড় করে বলার চেষ্টা করে, যদিও ওর চোখ দুটো, রোগা মুখে বেমানানভাবে বড়, আকাশের ধূসর, উদাসীন দিকেই স্থির থাকে। আকাশের সেই ভয়ংকর বোলতাগুলো খুঁজে।

আকাশটা এমন রাগী হয়ে ওঠার আগেও ওদের জীবন সহজ ছিল না। তার মনে আছে বাবা বাড়ি ফিরতেন, কাঁধ ঝুলে থাকত, কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর। “আবার পারমিট দিল না,” তিনি মাকে বিড়বিড় করে বলতেন, তাদের ছোট ঘরটায় পায়চারি করতে করতে। সে একবার জিজ্ঞাসা করছিল বাবাকে, বাবা পারমিট কী? বাবা কিছু বলে নি। “সমুদ্র বন্ধ করে দিয়েছে। জেলেরা যদি সমুদ্রে যেতে না পারে, তাহলে আমরা খাবো কী?” মা চুপচাপ শুনতেন, তার হাত ব্যস্ত থাকত কমতে থাকা ময়দার জোগান সামলাতে, আরও পাতলা রুটি বানাতে, মসুর ডালে আরও পানি মেশাতে। তার নড়াচড়া ছিল দ্রুত আর নিপুণ, কিন্তু তার হাসিটা মাঝে মাঝে চোখ পর্যন্ত পৌঁছাত না। “আমরা ঠিক চালিয়ে নেব, আবু ইউসুফ,” তিনি বলতেন, তার কণ্ঠস্বর নরম কিন্তু ক্লান্ত। “আল্লাহ ব্যবস্থা করবেন।” দিনে মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য বিদ্যুৎ থাকত, ইউসুফ যখন হোমওয়ার্ক শেষ করার চেষ্টা করত ঠিক তখনই তাদের অন্ধকারে ডুবিয়ে দিত। কলের পানিতে কোন স্বাদ নেই, তবে মাঝে মাঝে অদ্ভুত স্বাদের হত, ধাতব আর অচেনা। কিন্তু সেটাই ছিল তাদের জীবন, কষ্টের মধ্যেও চেনা ছন্দে বাঁধা। এই নতুন বাস্তবতা, এই অবিরাম ভয়ের গুঞ্জন, কোনো সতর্কতা ছাড়াই মাটির কেঁপে ওঠা, অন্যরকম। মনে হয় পৃথিবী নিজেই দম আটকে আছে, পরবর্তী ভয়াবহ আঘাতের অপেক্ষায়।

দূরের বিস্ফোরণের শব্দগুলো আর ততটা দূরে নয়, এখন আরও কাছে, আরও তীক্ষ্ণ। মাঝে মাঝে, ইউসুফ শব্দটা অনুকরণ করে, বুকের মধ্যে একটা নিচু গুড়গুড় আওয়াজ তুলে – হুমম্ফ – সেটাকে কম ভয়ের করে তোলার চেষ্টায়, কোনোভাবে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টায়। সে অন্য শিশুদেরও এটা করতে দেখেছে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খেলা এক নির্মম খেলা।

তার বাবাকে বলেছিল একবার, “বাবা, আমি ভয় পাচ্ছি না, কিন্তু… কিন্তু আমার বুকটা ভীতু খরগোশের মতো লাফাচ্ছে!” এটা ঠিক ভয় নয়, তীব্র আতঙ্ক নয়, কারণ এটি এখন গা সওয়া হয়ে গেছে। ভয় ও আতঙ্ক এখন খুব সাধারণ ব্যাপার। অনুভূতিগুলো হয়তো আস্তে আস্তে ভোঁতা হয়ে উঠেছে। তবে মাঝে মাঝেই জোরে চিৎকার করতে বাধ্য করে, বুকের ভিতর একটা চাপ ধরা অনুভূতি, চামড়ার নিচে একটা অবিরাম গুঞ্জন, দৌড়ে পালানোর ইচ্ছা অথচ কোথায় পালাবে জানা নেই।

লায়লা শব্দগুলো অনুকরণ করে না। সে শুধু কাঁদে, ইউসুফের কাঁধে বা মায়ের কোলে মুখ গুঁজে, তার ছোট হাত দুটো দিয়ে কান চেপে ধরে। তার ছোট্ট পৃথিবীটা, যা একসময় পরিচিত রুটিন – ঘুম থেকে ওঠা, মায়ের রুটি, শামসের সঙ্গে খেলা, শামস ওর খেলনা পুতুল, বাবার ফিরে আসা – এই সব দিয়ে বাঁধা ছিল, তা এমন শক্তির দ্বারা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল যা সে বুঝতেই পারছিল না।

কম্পনটা শুরু হয় মাটির গভীর থেকে, এক ভূগর্ভস্থ গোঙানির শব্দ যা ইউসুফের হাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে যায় শব্দটা কানে আসার আগেই। এটা আগের বিস্ফোরণগুলোর মতো নয়, যেগুলো শুধু জানালা কাঁপিয়ে দিত। এটা একটা গর্জন, একটা শারীরিক শক্তি যা তাদের ছোট্ট বাড়িটায় আছড়ে পড়ে। কিন্তু এবার শব্দটা শুধু কাছে নয়, একেবারে মাথার ওপরে। এক কান ফাটানো আর্তনাদ ছিঁড়ে ফেলে আকাশটাকে, তারপরই আসে এক ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণ। পৃথিবীটা যেন দুমড়ে মুচড়ে যায়। ধুলো, ধোঁয়া আর আগুনের হলকা এক মুহূর্তে ঘরটাকে গ্রাস করে। ছাদটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ে।

যখন জ্ঞান ফিরল, ইউসুফ নিজেকে খুঁজে পেল ভাঙা ইট-কাঠ-পাথরের নিচে। কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না। তালা লেগে গেছে। চারদিক অন্ধকার। দম বন্ধ করা ধুলোর গন্ধ। কাশতে কাশতে সে ডাকল, “মা! বাবা! লায়লা!” কোনো সাড়া নেই। শুধু এদিক ওদিক থেকে পাথর আর ভাঙা জিনিসপত্র সরানোর শব্দ আসছে। তার পা কিসের নিচে যেন আটকে আছে। নড়াতে পারছে না। অনেক কষ্টে, শরীরের সব শক্তি দিয়ে সে নিজেকে টেনে বের করার চেষ্টা করল। চোখের সামনে থেকে ধুলোর পর্দা সরলে দেখল, তাদের বাড়ি বলে আর কিছু নেই। শুধু ভাঙা ইট-পাথর, বাঁকানো লোহা আর কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া।

সে আবার ডাকে, এবার গলা চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে, “বাবা! মা!”

কাছেই একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পায় সে। লায়লা! সে হামাগুড়ি দিয়ে শব্দের দিকে এগোয়। দেখে, লায়লা একটা ভাঙা দেয়ালের পাশে পড়ে আছে, ধুলোয় ধূসর, ভয়ে চোখ বড় বড়। তার কপাল বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। “লায়লি!” ইউসুফ দৌড়ে ওর কাছে যায়, ওকে জড়িয়ে ধরে। লায়লা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে, একটা শব্দও করতে পারে না।

“মা কোথায়? বাবা?” ইউসুফ চারদিকে তাকায়। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে সে তার বাবার ছেঁড়া শার্টের একটা অংশ দেখতে পায়। তার পাশেই মায়ের পরিচিত কাপড়ের অংশ। তারা নড়ছে না। একেবারে স্থির। ইউসুফের ছোট্ট বুকটা হিম হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে। একটা ভয়ঙ্কর, ঠান্ডা উপলব্ধি তার শরীর বেয়ে নেমে আসে। তারা আর নেই।

“উঠতে হবে, লায়লি! আমাদের যেতে হবে!” সে বোনের হাত ধরে টান দেয়। লায়লা নড়তে পারে না, শুধু নীরবে কাঁদে। ঠিক তখনই বাইরের হৈচৈ শোনা যায়। কেউ একজন তাদের ভাঙা দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দেয়। “এখানে কেউ আছো? বাচ্চা!” একজন ছুটে আসে। সে দ্রুত ইউসুফ আর লায়লাকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে বের করে আনে।

রাস্তাটা চেনা যায় না। ধ্বংসস্তূপ, আগুন, ধোঁয়া আর মানুষের আর্তনাদে ভরা। মানুষজন পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে। ইউসুফ শক্ত করে লায়লার হাত ধরে রাখে। প্রতিবেশী লোকটি তাদের ভিড়ের মধ্যে ঠেলে দিয়ে বলে, “দক্ষিণে যাও! সবাই দক্ষিণে যাচ্ছে! জলদি!” বলেই সে অন্যদিকে ছুটে যায়।

ইউসুফ আর লায়লা এখন একা। ছয় বছরের ইউসুফ, আর তিন বা চার বছরের লায়লা। ইউসুফ লায়লাকে টেনে নিয়ে মানুষের স্রোতের সাথে মিশে যায়। সে জানে না কোথায় যাচ্ছে, শুধু জানে তাদের যেতে হবে। তার কাঁধে এখন পুরো পৃথিবীর ভার। লায়লা হোঁচট খেয়ে পড়ে যায়, ইউসুফ ওকে টেনে তোলে। তার নিজের চোখেও পানি আসছে, কিন্তু সে কাঁদে না। তাকে কাঁদতে মানা। সে এখন লায়লার অভিভাবক।

তারা হাঁটতে থাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সূর্য মাথার ওপর আগুন ছড়াচ্ছে। ধুলো তাদের শরীর ঢেকে দেয়। লায়লার কপাল থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে, কিন্তু জায়গাটা ফুলে আছে। সে মাঝে মাঝে দুর্বলভাবে ফুঁপিয়ে ওঠে। ইউসুফ ওকে প্রায় কোলে করেই টেনে নিয়ে যায়। পথে সে দেখে আরও অনেক শিশু, তাদের কারো কারো মুখেও একইরকম শূন্য দৃষ্টি। কেউ একা, কেউ অন্য কোনো পরিবারের সাথে মিশে গেছে। সে দেখে রাস্তার ধারে পড়ে থাকা শরীর, স্থির, নিথর। সে চোখ ফিরিয়ে নেয়, লায়লার মাথাটা নিজের বুকের দিকে চেপে ধরে।

তাদের বলা হয়েছিল দক্ষিণের রাস্তা “নিরাপদ”। কিন্তু মাথার ওপর ড্রোনের ভনভন শব্দ থামে না। মাঝে মাঝে দূরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। নিরাপত্তা একটা কথার কথা মাত্র। ইউসুফ শুধু হাঁটে, লায়লার হাত শক্ত করে ধরে। খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করে, গলা শুকিয়ে কাঠ। কোথায় পানি পাবে সে জানে না। কোথায় খাবার?

অবশেষে তারা পৌঁছায় দেইর আল-বালাহর কাছে এক বিশাল তাঁবুর ভিড়ে। এখানে হাজার হাজার মানুষ, সবাই তাদের মতো ঘরছাড়া। কোথায় থাকবে তারা? কোনো নির্দিষ্ট তাঁবু নেই তাদের। তারা একটা পুরনো, ছেঁড়া তাঁবুর এক কোণে গিয়ে বসে পড়ে। তাঁবুটা অন্য দুটো পরিবারের সাথে ভাগ করা। কেউ তাদের দিকে তাকায় না, সবাই নিজের চিন্তায় মগ্ন।

তাদের নতুন জীবন শুরু হয় লাইনে দাঁড়িয়ে। পানির জন্য দীর্ঘ লাইন। খাবারের জন্য লাইন, যেখানে বেশিরভাগ দিন মেলে শুধু শুকনো রুটি। শৌচাগারের জন্য লাইন। লায়লার কাশি শুরু হয়, রাতে জ্বর আসে। ইউসুফ অসহায় বোধ করে। সে কার কাছে সাহায্য চাইবে? মা নেই যে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। বাবা নেই যে ওকে ভরসা দেবে।

সে অন্য শিশুদের দেখে, যারা ধুলোর মধ্যে আপন মনে খেলে। কিন্তু ইউসুফের খেলতে ইচ্ছে করে না। তার বুকের ভেতরটা সবসময় ভয়ে আর চিন্তায় ভারী হয়ে থাকে। লায়লা বেশিরভাগ সময় চুপ করে থাকে, ইউসুফের গা ঘেঁষে বসে থাকে, অথবা জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে। তার পায়রা পাখির গানটা সে আর গায় না।

রাত নেমে আসে তাঁবুর শহরের ওপর। ঠান্ডা বাতাস বয়। ইউসুফ আর লায়লা ছেঁড়া তাঁবুর এক কোণে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। তাঁবুর কাপড়ের ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যায়। সেই একই উদাসীন আকাশ, যেখানে এখনও ‘জানানা’ ভনভন করে উড়ে বেড়ায়। লায়লা জ্বরের ঘোরে ছটফট করে, মাঝে মাঝে কঁকিয়ে ওঠে। ইউসুফ ওর কপালে হাত রাখে। গা এখনও গরম।

ইউসুফ জেগে থাকে। সে বাড়ির কথা ভাবে। মা আর বাবার কথা ভাবে। স্মৃতিগুলো এখন আরও বেশি কষ্ট দেয়। সে বুঝতে পারে, তারা আর কখনও ফিরবে না। বাড়ি বলে আর কিছু নেই। মা-বাবা বলে কেউ নেই। আছে শুধু সে আর লায়লা, এই ঠান্ডা মাটিতে, এই বিশাল, অচেনা পৃথিবীর বুকে ভেসে থাকা দুটো ছোট শিশু।

তার নিজের চোখে পানি নেই, কিন্তু বুকের ভেতরটা কান্নায় ফেটে যেতে চায়। সে শক্ত করে লায়লার হাতটা ধরে। বোনের গরম, জ্বরাক্রান্ত নিঃশ্বাস তার ঘাড়ে এসে লাগে। এটাই এখন তার পৃথিবী। এই দুর্বল নিঃশ্বাসটুকু টিকিয়ে রাখাই তার একমাত্র কাজ। মাথার ওপরের আকাশটা চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। ধুলোর স্বাদটা তার মুখে স্থায়ী হয়ে গেছে। ভবিষ্যত বলে কিছু নেই, আছে শুধু এই মুহূর্তের ঠান্ডা, খিদে আর ভয়। আর আছে লায়লার ছোট হাতটা, যা সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে রাখে, যেন এটাই তার ডুবে যাওয়া পৃথিবীর শেষ অবলম্বন।

পৃথিবী তাকিয়ে দেখছে, অথবা দেখছেও না।