প্রােগ্রামিংয়ে দক্ষ হওয়ার বিজ্ঞানসম্মত উপায়

A N M Bazlur Rahman

2019/02/26

Tags:    

জ্ঞান ও দক্ষতার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য আছে। বই পড়ে আমরা জ্ঞান অর্জন করতে পারি কিন্তু দক্ষতা অর্জন করতে পারি না। দক্ষতা অর্জন করতে হয় অনুশীলন করে। এর কোনো বিকল্প নেই। যেমন- আমরা প্রত্যেকেই ক্রিকেট সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখি, কিন্তু সাকিব আল হাসানের মতো আমরা খেলতে পারি না। এর কারণ সাকিব আল হাসান প্রচুর অনুশীলন করে ক্রিকেট খেলায় দক্ষতা অর্জন করেছেন, আমরা তা করিনি। একই বিষয়টি অন্য যেকোনো বিষয়ের জন্য সত্য। যেমন- প্রোগ্রামিং। প্রোগ্রামিংয়ের জন্য অনুশীলনের বিকল্প নেই। আমরা বই পড়ে প্রোগ্রামিং কীভাবে করতে হয়, এর নিয়মকানুনগুলো সম্পর্কে বিস্তর ধারণা নিতে পারে। কিন্তু অনুশীলন না করলে এই বিষয়টি রপ্ত করতে পারবো না।

এখন প্রশ্ন হতে পারে, কীভাবে অনুশীলন করলে একটি বিষয় সম্পর্কে দক্ষ হওয়া যায়? এর কি কোনো বৈজ্ঞানিক উপায় রয়েছে যা করে আমরা প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ হতে পারি?

এর উত্তর হলো- হ্যাঁ।

এর জন্য একটি চমৎকার বই আছে। বইটির নাম – Peak: Secrets from the New Science of Expertise by K. Anders Ericsson, Robert Pool

এই বইটিতে একটি চমৎকার পদ্ধতির কথা বলায় হয়েছে। এটি হলো- deliberate practice বা স্বপ্রণোদিত অনুশীলন।

এর কতগুলো বৈশিষ্ট্যও এই বইতে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। চলুন এগুলো সম্পর্কে একটু আলোচনা করি-

১. দক্ষতা:  এই অনুশীলন মূলত কাজ করে দক্ষতা অর্জনের লক্ষে। এর মূল লক্ষ্য জ্ঞান অর্জন নয়। অনেক মানুষই জ্ঞান অর্জনের কথা বলে। জ্ঞান অর্জনের কোনো বাঁধা নেই। আমরা ইচ্ছে মত অনেক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে পারি। তবে জ্ঞান থাকলে আমরা একটি কাজ সুসম্পন্ন করতে পারবো তা কিন্তু সবসময় সঠিক নয়। ওপরের ক্রিকেট খেলার উদাহরণটিই আবার বলা যায়। ক্রিকেট সম্পর্কে জ্ঞান থাকলেও আমরা দক্ষ ক্রিকেটার হতে পারবো না। কোনো বিষয়ে দক্ষ বা পারদর্শী হতে হলে সেই বিষয়টি নিয়ে অনেক বেশি অনুশীলনের প্রয়োজন। তাই deliberate practice মূলত কাজ করে কোনো বিষয়ের ওপর দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে। শুধুমাত্র জ্ঞানার্জনে সীমাবদ্ধ থাকলে কোনো বিষয়ের কুশলী হওয়া সম্ভব নয়।

২. বেশি আরামপ্রিয় হওয়া যাবে যাবে না: আমরা যে বিষয় সম্পর্কে ইতিমধ্যে সিদ্ধহস্ত সেই বিষয়ের ওপর এই Deliberate practice কাজ করে না। কোনো বিষয়ে দক্ষ হতে হলে আমাদের আরামদায়ক অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। যা ইতিমধ্যে করতে পারি, তার থেকে একটি কঠিন বিষয় নিয়ে অনুশীলন করতে হবে। তবে অনেক বেশি কঠিন হওয়া যাবে না। কারণ, এতে ব্যর্থ হওয়া সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আমাদের প্রত্যেকের একটি আরামদায়ক অবস্থান থাকে। এর একটু বেশি হতে হবে। আমরা যখনই কিছু করছি, একটু নতুন কিছু করার চেষ্টা করতে হবে। উদহারণ হিসেবে বলা যায়- আপনি হয়তো অবজেক্ট ওরিয়েন্টেড প্রোগ্রামিং জানেন। কিন্তু ডিজাইন প্যাটার্ন সম্পর্কে ধারণা নেই। আপনি যা জানেন, তা দিয়েই যদি সবসময় প্রোগ্রামিং করে যান, তাহলে নতুন কিছু শিখবেন না। ডিজাইন প্যাটার্ন সম্পর্কে আপনার জ্ঞান থাকতে পারে, কিন্তু সেগুলোকে প্রোগ্রামে প্রয়োগ না করলে এই বিষয় সম্পর্কে আপনার দক্ষতা তৈরি হবে না। যখনি নতুন কোনো প্রজেক্টে কাজ করতে যাবেন, তখনি নতুন কিছু জিনিস প্রয়োগ করতে পারেন। এতে যদিও ব্যার্থ হওয়ার সম্ভবনা থাকে, এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। ব্যার্থতাকে মেনে নেওয়ার মত মানুষিকতা থাকতে হবে এবং হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। বরং খুঁজে বের করতে হবে কী কারণে হলো না। একবার না পারলে আবার চেষ্টা করতে হবে। একটি  উপায়ে কাজ না করলে অন্য উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

৩. সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ: ডেলিবারেট প্র্যাকটিস শুরুর আগে লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। লক্ষ্যটি হতে হবে সুনির্দিষ্ট। একটি বড় বা কতগুলো ছোট ছোট লক্ষ্য হতে পারে। তবে এগুলো অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হতে হবে। উদাহরণ- আমার লক্ষ্য হতে পারে, আমি ডেটা স্ট্রাকচার ও এলগরিদমে দক্ষ হতে চাই। কিন্তু ডেটা স্টাকচার ও এলগরিদমের ব্যপ্তি অনেক বড়। এর জন্য আগে আমাদের ছোট ছোট লক্ষ্য  নির্ধারণ করতে হবে। আমরা লক্ষ্য হতে পারে, আমি আগে বেসিক ডেটা স্ট্রাকচার যেমন- লিস্ট, সেট, লিংকলিস্ট সম্পর্কে দক্ষ হতে চাই। এরপর আমি সর্টিং এলগরিদমগুলো নিয়ে দক্ষ হতে চাই। লক্ষ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একজন মেন্টর বা কোচের সাহাজ্য নেওয়া জরুরি। কারণ যে বিষয়ে দক্ষ হতে চাই তার সঙ্গে আমাদের লক্ষ্য (goal) ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমি যদি ডেটা স্ট্রাকচার ও এলগরিদমে দক্ষ হতে চাই, তাহলে এর জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। দক্ষতার সঙ্গে লক্ষ্যকে মেলানের জন্য মেন্টর বা কোচের কাছে যেতে হবে।

৪. স্বপ্রণোদিত: এই অনুশীলন অবশ্যই স্বপ্রণোদিত হতে হবে। এর অর্থ আপনি স্বেচ্ছায় পূর্ণ মনযোগ দিয়ে এই অনুশীলটি করে যাচ্ছেন। এটি শুধুমাত্র মজা করার জন্য করা যাবে না। অনেক সময় আমরা শখের বশে কোনো কাজ শুরু করি। তারপর একটু করে পরে আর করা হয় না। অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে যাই। এরকম হলে হবে না। আপনি যখন এই অনুশীলনটি করছেন, তখন আপমি আপনার আরামদায়ক অবস্থান থেকে বের হয়ে এসে কাজটি করছেন। এটি একটু ক্লান্তিকরণ মনে হবে। এর জন্য আপনাকে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নিতে হবে। টানা লম্বা সময় ধরে না করে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়াটায় শ্রেয়। এর জন্য পোমোডরো টেকনিকটি ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যখন অনুশীলণ করছেন, তখন যেন আপনার দৃষ্টি এই কাজটিতেই নিবদ্ধ থাকে এবং সম্পূর্ণ মনযোগ থাকে।

তাহলে প্রথমে যে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে চান তা নির্ধারণ করুন, এর জন্য লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। এরপর আরামদায়ক অবস্থান থেকে বের হয়ে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে অনুশীলন করতে শুরু করুন।

৫. এক্সপার্টদের থেকে ফিডব্যাক:  অনুশীলন করার সময়ে এক্সপার্টদের কাছ থেকে ফিডব্যাক নিতে হবে। এর কারণ যদিও এটি স্বপ্রণোদিত অনুশীলন, কিন্তু অনুশীলনটি সঠিক হতে হবে। বুঝতে হবে কোথায় ভুল হচ্ছে। ভুলগুলো বুঝতে পেরে তা ঠিক করতে হবে। কারণ ভুল চর্চা চালিয়ে ভুল বিষয়ে দক্ষ হওয়ার কোনো অর্থ নেই। এজন্য  এক্সপার্টদের পরামর্শ অত্যন্ত জরুরি।

৬. মেন্টাল রিপ্রেজেন্টেশন:  স্বপ্রণোদিত অনুশীলনের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো মেন্টাল রিপ্রেজেন্টেশন বা ম্যাপ তৈরি করা এবং এর উন্নতি করা। আমরা জানি যে, কোনো একটি কঠিন দক্ষতার জন্য আমাদের মস্তিষ্কে অনেক বেশি তথ্য রাখতে হয়। আমাদের মস্তিষ্কে তথ্য রাখে বিভিন্ন প্যাটার্ন, ছবি, গন্ধ সম্পর্ক ইত্যাদির মাধ্যমে। বেশি বেশি অনুশীলনের মাধ্যমে এইসব প্যাটার্ন বা আকৃতি আমাদের মস্তিষ্কে ধরা পরে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হয়। এতে করে আমরা সেই বিষয় সম্পর্কে অনেক বেশী তথ্য মনে রাখতে পারি। কোনো বিষয়ের ওপর মেন্টাল রিপ্রেজেন্টেশন তৈরি হলে সেই বিষয়ে কাজ করতে গেলে ভুল হওয়ার সম্ভবনা কমে যায়। ভুল হলেও আমরা দ্রুত ঠিক করে ফেলতে পারি। এই যেমন- আমরা যখন বই পড়ি, তখন প্রতিটি শব্দ আমাদের বানান করে পড়তে হয় না, বরং শব্দের প্যাটার্ন দেখেই আমরা বুঝতে পারি শব্দটি কী। এর কারণ শব্দগুলোর একটি মেন্টাল রিপ্রেজেন্টেশন আমাদের তৈরি হয়ে গেছে।

তাহলে ওপরের অংশে আমরা দেখলাম স্বপ্রণোদিত অনুশীলন কী। এই অনুশীলন করে প্রোগ্রামিংয়ে দক্ষ হওয়ার তিনটি ধাপ রয়েছে। এগুলো হলো-

১. এক্সপার্ট খুজে বের করা:  যে বিষয়ে দক্ষ হতে চাই সেই বিষয়ের একজন এক্সপার্ট খুঁজে বের করতে হবে। মনে করুন, আপনি জাভা বিষয়ে দক্ষ হতে চান। তাহলে প্রথমে জাভা এক্সপার্টদের একটি লিস্ট তৈরি করুন। এরা হতে পারে বইয়ের লেখক, পাবলিক স্পিকার, ওপেনসোর্স ডেভেলপার ইত্যাদি। এই লিস্টের সবার কাছে হয়তো আপনি পৌছাতে পারবে না। এই লিস্ট থেকে যাদের কাছে পৌছাতে পারবেন, তাদেরকে আলাদা করুন। এরপর কীভাবে তাদের কাছে পৌছতে পারবেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন, অর্থাৎ তাদেরকে বা কোনো একজনকে কীভাবে আপনার মেন্টর বানাবেন তা নিয়ে পরিকল্পনা করুণ।

**২. এক্সপার্টরা কী করে তা খুঁজে বের করা:  **এর পরের ধাপটি হবে, এই এক্সপার্টরা আসলে কী কাজ করে যাতে তারা এক্সপার্ট হয়েছেন। এরা যদি কোনো বইয়ের লেখক হন, তাহলে তাদের বই পড়ুন। তাদের ব্লগ থাকলে সেগুলো পড়ুন। তারা যেসব প্রজেক্টে কন্ট্রবিউট করে সেগুলো দেখুন। এগুলো থেকে অনেক তথ্য পেয়ে যাবেন। সবচেয়ে ভাল হয় যদি আপনি তাদেরকে ডিরেক্ট প্রশ্ন করে জানতে পারেন। এর জন্য সুন্দর করে গুছিয়ে ইমেইল করুন। ফেসবুকে বা ফোন করাটা অনেকসময় উচিৎ নয়। অনেকেই বিরক্ত হতে পারে।

৩. পরিকল্পনা তৈরিঃ এ পর্যায়ে আপনি জানেন আপনার মেন্টর কে এবং আপনাকে কী কী বিষয়ে সম্পর্কে জানতে হবে। এই বিয়ষগুলো নিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করুন এবং অনুশীলন করতে শুরু করুন।

তাহলে আমরা জানলাম স্বপ্রণোদিত অনুশীলনই হ্চ্ছে একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি কেনাে বিষয়ে দক্ষ হওয়ার।  তো হয়ে যান একজন দক্ষ প্রোগ্রামার!

Categories: